সতেরোই জানুয়ারি, উনিশশো বারো।
আশঙ্কাই সত্যি হলো!
দক্ষিণ মেরুবিন্দুতে পৌঁছে আমুন্ডসেনের তাঁবুর উপরে নরওয়ের পতাকা দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারলো না রবার্ট ফ্যালকন স্কট। প্যান্টের পকেট থেকে ইউনিয়ন জ্যাকটা বার করে ব্যাগে পুরে নিলেন।
“তোমরা নিজেদের কাজ শুরু করে দাও।” সহকারী চার জনের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে টেন্টের মধ্যে প্রবেশ করলো স্কট।
ক্যামেরা সেটআপ করা শুরু করলো হেনরি রবার্টসন বোয়ার্স, আর পুরো জায়গাটার পেন্সিল স্কেচ করতে বসে গেল এডওরার্ড এড্রিয়ন উইলসন।
চার দিকের এই বরফের সাম্রাজ্য একেই মানসিক দৃঢ়তা ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, তার উপর যদি শেষ বিন্দুতে পৌঁছে দেখা যায় যে সেখানে আগেই কেউ পৌঁছে গেছে, এতদিনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, দক্ষিণ মেরুতে তাদের আগেও পৌঁছে গেছে পাগল নরওয়েয়ানটা তাহলে মন ভেঙে যেতে বাধ্য।
তবে, স্কট ভদ্রলোকের ছেলে, রয়াল নেভির ক্যাপ্টেন নিজের পরাজয়কে স্বীকার করেও আনন্দ পেলেন কারণ দক্ষিণ মেরু জয় করা যে সম্ভব সেটা সবার আগে পৃথিবীকে তো তিনিই বুঝিয়েছিলেন। বিরাশী ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশতে যে আনটার্র্কটিক প্লেটুর মধ্যে দিয়েই যে দক্ষিণ মেরুবিন্দু অবস্থিত সেটা স্কট ছাড়া পৃথিবী জানতে পারতো কি?
হ্যাঁ, ভুল করেছিলো কিছুটা, চার বছরের ছোট আমুন্ডসেন যে এক্সেল হেইবার্গ গ্লেশিয়ারের রাস্তাটা ধরবে সেটা শোনার পর একটু অবাকই হয়েছিলেন। কুকুরে টানা শ্লেজ গাড়ি করে ঐ রাস্তা দিয়ে আজ অবধি কেউ হাঁটেনি। আর রোয়াল্ড আমুন্ডসেন নাকি ঐ রাস্তা ধরেই যাবে। আচ্ছা পাগল লোক তো। বেশি না একটা ফাটলই যথেষ্ট, পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য।
কিন্তু আজ এই নব্বই ডিগ্রি দক্ষিণে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমুন্ডসেনের প্ল্যানটাকে অবাস্তব বলে ভেবে নেওয়া উচিত হয়নি। ব্রিটিশ মিডিয়ার কথা ভেবে একটু হেসেও ফেললো স্কট। নিশ্চয়ই ওর মুন্ডুপাত করবে বোকা পাঠাগুলো। বলবে কুকুরে টানা শ্লেজ না নিয়ে তার জায়গায় মোটর গাড়ি আর ঘোড়া দিয়ে মাল টেনে সময় নষ্ট করেছে স্কট।
ইসস! খুব আফসোস হচ্ছে ওর, যদি কুড়ি দিন বরফে ওর জাহাজ টেরা-নোভা আটকে না থাকতো, তাহলে অন্তত পনেরো দিন আগেই পৌঁছাতে পারতো।
তবে তাতে লাভ হতো কি? টেন্টের মধ্যে আমুন্ডসেনের নোটটা পেয়েছে স্কট। প্রায় এক মাস আগের আঠারো ডিসেম্বর, উনিশশো এগারোতেই দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছে নরওয়ের পতাকা তুলে ফেলেছে আমুন্ডসেন।
টেন্ট থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলো বোয়ার্স ক্যামেরা সেট আপ করে ফেলেছে।
“টেন্টটাকে বাদ দিয়ে ছবি নেব?” স্কটকে বাইরে আসতে দেখে বললো বোয়ার্স।
উত্তর দেওয়ার আগে বাকিদের মুখের দিকে তাকালো স্কট। বোয়ার্স ছাড়াও বাকি যে তিনজন আছে উইলসন, ইভানস আর ওটস, সবার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করলো স্কট।
কিন্তু ক্লান্ত, অবসন্ন, হেরে যাওয়া মুখগুলোতে যেন কোনো কিছুর উত্তরই ফুটে উঠলো না।
“নাহ! ওদের টেন্টের সাথেই ছবি তোলো। হতে পারে আমরা প্রথম হইনি, কিন্তু তার মানে এটা নিশ্চয়ই নয় যে আমরা হেরে গেছি। প্রকৃত বিজয়ী সেই হয় যে নিজের প্রতিযোগীদের সন্মান জানাতে পারে।” দৃঢ় কন্ঠে বললো ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট।
ছবি তোলা হয়ে গেলে বাকিদের তাড়া দিল স্কট, “শোনো তাড়াতাড়ি নামতে হবে। আসার উত্তেজনায় বুঝতে পারোনি কি পেরিয়ে এসেছ। সাড়ে আটশো মাইল নামতে হবে। ওহ! ভগবান, কি বিশ্রী জায়গা এটা!”
সেই মতন উনিশে জানুয়ারি নামা শুরু করলো টেরা-নোভা এক্সপেডিশন টিম। দক্ষিণ মেরুবিন্দু যাত্রার অনেক আগে থেকেই স্কট দক্ষিণ মেরুতে বসবাস করছিলো। দক্ষিণ মেরুর আবহওয়া সমন্ধে সব থেকে বেশি গবেষণাও করেছিলো ও। সেই হিসাবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের তাপমাত্রা সবথেকে অনুকূল এই যাত্রার জন্য, সেটাই হিসাবে পেয়েছিল স্কট।
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো নামা শুরু করার সাথে সাথেই। আবহাওয়া আচমকা খারাপ হতে শুরু করলো যা সম্পূর্ণ ধারণার বাইরে ছিল স্কটের। বিয়ার্ডমোর গ্লেশিয়ার থেকে মাত্র একশো মাইল দূরে প্রথম মারা গেল ইভানস, সেদিন ছিলো সতেরোই ফেব্রুয়ারি, উনিশশো বারো।
প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য সাথে জ্বালানী আর কাজ করছে না, খাদ্যদ্রব্য যা ছিলো তাও শেষের পথে, এদিকে তখনো পেরোতে হবে চারশো মাইল, স্কট আর ওর অবশিষ্ট দল নিজেদের শরীর আর মনের সব শক্তি সঞ্চয় করে এগোতে লাগলো।
যাত্রা শুরুর সময়ে টেরা-নোভা এক্সপিডিশনের বাকি সদস্যদের বেস ক্যাম্পেই থাকার নির্দেশ দিয়ে এসেছিলো স্কট। সেই হিসাবে পয়লা মার্চ দলের সদস্য এটকিন্সনের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে বিরাশী ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থিত বেস ক্যাম্পে স্কটের সাথে দেখা করার কথা ছিলো। কিন্তু ঘটনাচক্রে এটকিন্সন পৌঁছাতে পারেনি, আর স্কট সময়ের তিন দিন আগেই পৌঁছে গেছিলো।
তিন দিন অপেক্ষার পরও যখন এটকিন্সন বা বাকি কেউ এলো না তখন স্কটের মনে হলো নিশ্চয়ই কিছু ভুল হয়েছে। ইতিমধ্যে তুষার ঝড় শুরু হয়ে গেছে যা মার্চের শুরুতে অভাবনীয় না হলেও অপ্রত্যাশিত ছিলো স্কটের কাছে।
দোসরা মার্চ ওটসের পা বরফে খেয়ে নিলে দলের স্বার্থে তুষার ঝড়ের মধ্যে বেরিয়ে পরে নিজেকে শেষ করে দিলো ওটস।
স্কট আর বাকি দুই সাথী বেস ক্যাম্প ছেড়ে উত্তরের দিকে যাওয়া শুরু করে দিলো ঝড় শেষ হওয়ার সাথে সাথেই। কিন্তু ক্ষুদার্থ শরীরগুলোর ক্ষমতা সীমিত হয়ে এসেছিলো।
অবশেষে ঊনত্রিশে (মতান্তরে ত্রিশে) মার্চ আর শরীর দিলো না ওদের। নিজের ডায়েরি শেষবারের মতন বার করলো রবার্ট ফ্যালকন স্কট। প্রতিটা সাথীর পরিবারের উদ্দেশ্যে, নিজের পরিবারের উদ্দেশ্যে বিদায়বার্তা লিখলো স্কট।
তারপর পৃথিবীর উদ্দেশ্যে লিখলো, “আমরা ঝুঁকি নিয়েছিলাম, আমরা জানতাম যে আমরা যে ঝুঁকি গুলো নিয়েছি সেগুলো আমাদের বিরুদ্ধে বেরিয়ে এসেছে, এবং তাই আমাদের অভিযোগের কোনও কারণ নেই, তবে দুরদর্শিতার অভাবের কাছে নত হয়েছি, শেষ পর্যন্ত আমাদের সেরাটা দেওয়ার জন্য এখনও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ... আমরা যদি বেঁচে থাকতাম, আমার একটি গল্প বলার ছিল, আমার সঙ্গীদের দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং সাহস যা প্রতিটি ইংরেজের হৃদয়কে আলোড়িত করবে। এই মোটামুটি নোটগুলি এবং আমাদের মৃতদেহগুলি অবশ্যই গল্প বলবে, তবে অবশ্যই, অবশ্যই, আমাদের মতো একটি মহান দেশ দেখতে পাবে যে যারা আমাদের উপর নির্ভরশীল তাদের আমরা হতাশ করিনি।”
দক্ষিণ মেরুতে আমুন্ডসেনের তাঁবুর সামনে ব্রিটিশ টেরা-নোভা অভিযাত্রী দলের ছবি।